মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে সতর্ক অবস্থান

ফেড সুদহার কমালেও রয়ে গেছে মার্কিন অর্থনীতির অনিশ্চয়তা

চলতি বছর প্রথমবারের মতো সুদহার কমাল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)।

চলতি বছর প্রথমবারের মতো সুদহার কমাল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছে ভবিষ্যতে সুদহার নিয়ে আরো সতর্ক অবস্থান গ্রহণেরও। ফেড জানিয়েছে, সংস্থাটির সুদহার কর্তনসংক্রান্ত পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির ওপর। মার্কিন আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন মন্তব্য থেকে দেশটির অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বজায় থাকার আশঙ্কা করছেন অনেক বিনিয়োগকারী। বিশেষ করে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্যাগফ্লেশনের (উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে নিম্ন প্রবৃদ্ধিও কর্মসংস্থান) আশঙ্কা করছেন তারা। খবর রয়টার্স ও এপি।

ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) বুধবার শুরু হওয়া সভায় সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ সীমায় নির্ধারণ করা হয়। এ সময় মার্কিন শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা দুই-ই বিরাজমান থাকায় মুদ্রানীতি শিথিল করার ক্ষেত্রে ফেড কোনো তাড়াহুড়া করবে না বলেও ইঙ্গিত দেয়া হয়।

‘নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে ফেড চেয়ার জেরোম পাওয়েল বলেন, ‘মার্কিন অর্থনীতিতে এখন দুটি ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও নিম্ন কর্মসংস্থান। এ দুই সূচকের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেবে ফেড।’

সাধারণত অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সুদহার কমানো হয়। বাড়ানো হয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে। সুদহার হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রণোদনা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের এ কৌশলকে বলা হয় ‘মুদ্রানীতির ডুয়াল ম্যান্ডেট’।

ব্র্যান্ডিওয়াইন গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ম্যানেজার জ্যাক ম্যাকইনটায়ার বলেন, ‘কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল শ্রমবাজার প্রত্যাশা করছে। এটি আর্থিক সম্পদের জন্য ভালো পরিবেশ নয়।’

গত বুধবার প্রান্তিকভিত্তিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও প্রকাশ করেছে ফেড। এতে অন্তর্ভুক্ত ‘ডট প্লট’ অনুসারে, চলতি বছর আরো ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কর্তন হতে পারে। আশঙ্কার বিষয় হলো, বছরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি থাকবে ৩ শতাংশ, যা ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্য থেকে অনেক বেশি। জুনে শেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। পুরো বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে ফেডের দ্রুত সুদহার কর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি কার্যকর নাও হতে পারে। এছাড়া ফেডের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মতপার্থক্যের কারণেও বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

গবেষণা সংস্থা ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ল্যারি হ্যাথওয়ের মতে, ‘বাজারের অনেকেই ফেডের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব দেখে কিছুটা হতাশ। বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে সুদহার কমার পক্ষে নেই ফেড, ডাটানির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করছে তারা।’

জেনাস হেন্ডারসন ইনভেস্টরসের গ্লোবাল শর্ট ডিউরেশন ও লিকুইডিটি প্রধান ড্যান সিলুক বলেছেন, ‘আর্থিক শিথিলীকরণের এ প্রচেষ্টাকে বাজার স্বাগত জানাতে পারে। তবে ফেডের বার্তা সতর্কতামূলক এবং তারা মুদ্রানীতিতে পুরোপুরি পরিবর্তন আনবে না।’

গত মাসে সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে মার্কিন ভোক্তামূল্য সূচক। এতে দেশটিতে স্ট্যাগফ্লেশনের আশঙ্কা বাড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সর্বশেষ দেখা গেছে ১৯৭০-এর দশকে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান বাড়াতে বড় আকারে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা সীমিত হয়ে আসে।

ফেডের এবারের পদক্ষেপকে বাড়তি মনোযোগে রেখেছিল মার্কিন ট্রাম্পের প্রশাসনের চাপ। সভার শেষ মুহূর্তে ফেড বোর্ডের গভর্নর হিসেবে শপথ নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মিরান। উপস্থিত গভর্নরদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কম হওয়ার বিরোধিতা করেন। তার অভিমত ছিল, সুদহার কমানো হোক ৫০ বেসিস পয়েন্ট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিশ্চয়তা থাকলেও ফেডের সিদ্ধান্ত কিছু ক্ষেত্রে মার্কিনদের জীবনযাত্রা সহজ করবে। সুদহার নিয়মিতভাবে কমলে মর্টগেজ খাতে এর প্রভাব পড়বে ধীরে ধীরে। গত তিন বছরে ফেডের উচ্চ সুদের কারণে অটো লোনের হার বেড়েছে, যা ধীরে ধীরে কমতে পারে। ক্রেডিট কার্ডে গড় সুদহার বর্তমানে ২০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এতেও ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে ফেডের সিদ্ধান্ত।

সপ্তাহের শুরুর মতো গতকালও সর্বাধিক উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থান করছিল ওয়াল স্ট্রিটের সূচকগুলো। এদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে ডাও জোন্স সূচক দশমিক ৬ শতাংশ বাড়লেও দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে নাসডাক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ওঠানামা ওয়াল স্ট্রিটে খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ সুদহার কমানোর বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার নিশ্চিত ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে ভবিষ্যতে সুদহার কর্তনের গতি সম্পর্কে ফেড সদস্যদের ইঙ্গিত বাজারে প্রভাব ফেলেছে।

এশিয়ার বাজারে গতকাল বেশির ভাগ সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ ও দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩ ও ১ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট ও হংকংয়ের হ্যাং সেং দুটো কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৬ ও দশমিক ২ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি এএসএক্স সূচক কমেছে দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া ভারতের বিএসই সেনসেক্স ও তাইওয়ানের তাইএক্স বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক ৪ ও ১ দশমিক ১ শতাংশ।

সুদহার কর্তনের পর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বন্ডের দাম কিছুটা কমেছে ও ইল্ড বেড়েছে। কিছুটা সংকুচিত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বন্ডের ইল্ডের পার্থক্য। এছাড়া ডলারের সঙ্গে বিনিময় হারেও কিছুটা দুর্বলতা দেখিয়েছে ইয়েন ও ইউরো।

আরও